প্রত্যেকদিনের মতো আজকেও সকালে ঘুম থেকে উঠেছি; অন্যান্য দিনের মতো আজকে সকালটা স্বাভাবিকভাবেই শুরু হওয়ার কথা। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের লাল আভা দেখা যাচ্ছে। শীতকে বিদায় করে এখন চারিদিকে বসন্তের আবির্ভাব ঘটেছে। গাছে গাছে কেবল নতুন পাতা গজাতে শুরু করেছে। চারদিক থেকে ভেসে আসছে ফুলের গন্ধ; পাখিরা সব গান গাইতে শুরু করেছে আর মৌমাছিরা নতুন দিনের আগমনের সাথে সাথে ঝাঁক বেঁধে ছুটতে আরম্ভ করেছে ফুল থেকে মধু আহরণ করতে। বাতাসও এ সময় অনেকটা শান্তভাবে প্রবাহিত হচ্ছে; কেউ দেখলে বলবেই না সদ্য বিদায় জানানো শীতের সময় এখানকার অবস্থা এতোটা রুক্ষ আর নির্জীব হয়ে পড়েছিলো; প্রকৃতির এ সজীবতা হয় তো আমার জীবনে সঞ্চারিত হতে পারতো কিন্তু আজকের দিনে সেটি আর হলো না। কোনও এক কারণে অতীতের কোনও এক স্মৃতি এসে ক্ষণিকের জন্য আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেলো হারিয়ে যাওয়া একটি দিনের ভেতরে। জীবনে বসন্ত এসেছিলো বলতে গেলে সেই এক দিন্। কয়েক সেকেণ্ডের জন্য সে দিনে ফিরে গেলেও যখন আবার বাস্তবতার মাঝে ফিরে আসলাম তখন দেখলাম হায় জীবন থেকে হারিয়ে গেছে অনেক সুন্দর একটি মুহূর্ত; জানি না কোনও দিন্ সেটি আর জীবনে ফিরে আসবে কি না!
বুখারেস্টের সিটি সেন্টার
অনেক কষ্ট আর না প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে কেঁটেছে এ জীবন; জীবনের হতাশা একটা পর্যায় এসে এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকেছিলো যে কোনও দিন্ একটা হাসি হাসতে পারবো সেটা কল্পনা করা ভুলে গিয়েছিলাম। আসলে আমার এখন যে রকম বয়স অর্থাৎ উঠতি বয়সের যাঁরা আমরা তাঁদের জীবনে হতাশা জিনিসটি স্বাভাবিক বৈ অন্য কিছু নয়। অনেক দেশ ঘুরেছি, অনেক মানুষের সাথে কথা বলেছি, অনেক কিছুর স্বাদ নিয়েছি কিন্তু সেই দিনের সে অভিজ্ঞতা কিংবা স্বাদ ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। দিনের শুরুটা হয়েছিলো মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে আর শেষটা হয়েছিলো কান্না আর হতাশা দিয়ে। সত্যিকারের ভালোবাসা আর মন থেকে হাসির সে স্বাদটি বোধ জীবনে প্রথমবার সেদিন আমি পেয়েছিলাম আবার হৃদয় ভাঙার সত্যিকারের ব্যাথাটি সেদিন পেয়েছিলাম। সে দিন্ ছিলো সব কিছু পাওয়ার দিন্, সে দিন্ ছিলো একই সাথে সব কিছু হারাবার দিন্। সে দিন্ ছিলো জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর মধ্যে একটি, সে দিন্ ছিলো জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন্। কেনও এ দুই মেরুর বৈপরিত্য? আজকে সে গল্পই করবো।
২০১৮ সালের ০৫ই এপ্রিল। জীবনে সে দিন সত্যিকারের জুয়া খেলেছিলাম; স্প্রিং এর ছুটির কারণে সে সময় ইউনিভার্সিটি বন্ধ ছিলো। মার্চ মাসের শেষের দিকের কোনও এক সময় হতে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকের মধ্যবর্তী একটি সপ্তাহ। ক্যাথলিক চার্চে বিশ্বাসী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা এ সময় ইস্টার উৎসবে মেতে উঠে। বড়দিনের পর ইস্টার হচ্ছে ক্যাথলিক চার্চে বিশ্বাসী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেদের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ইউরোপে আসার পর থেকে কেনও জানি আমার মাঝে বুলগেরিয়া আর রোমানিয়া এ দুইটি দেশ নিয়ে আমার বিশেষ একটা আগ্রহ কাজ করতো। বিশেষ করে এই দুইটি দেশের ভাষা আর সংস্কৃতিকে কাজ থেকে দেখার একটা আগ্রহ সে সময় প্রবলভাবে কাজ করেছে। এ কারণে পরিকল্পনা করে করলাম সে বারের বসন্তকালীন ছুটিতে এ দুইটি দেশ ভ্রমণে বের হবো। এরোপ্লেনের টিকেটও করে ফেললাম হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট থেকে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়াতে পৌঁছানোর জন্য। বুলগেরিয়া দিয়েই শুরু করলাম সে বছরের স্প্রিং এর ছুটির প্রথম দিনটি। বুলগেরিয়াতে প্রধানত আমার টার্গেট ছিলও ছিলো রাজধানী সোফিয়া এবং বুরগাসে অবস্থিত সানি বীচ ও নেসেবারের ওল্ড টাউনকে কাছ থেকে অবলম্বন করা। সবাই বলে যদি কেউ বুলগেরিয়াতে ভ্রমণে আসেন তাহলে না কি কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের আধার এ বুরগাস শহরে না ঘুরলে না কি বুলগেরিয়া ভ্রমণের স্বাদ পাওয়া যায় না। রিলা মাউনটেন, পিরিন ন্যাশনাল পার্ক, ভেলিকো তারনভো, পৃথিবীর গোলাপ ফুলের বাগান খ্যাত কাজানলাক এ সকল জায়গাতেও যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়াতে অবস্থিত আলেকজান্ডার নেভস্কি ক্যাথেড্রাল ছাড়া আর তেমন কোনও কিছু আমাকে আকর্ষণ করে নি। বুলগেরিয়াকেও তেমনভাবে আমি ভালো লাগাতে পারি নি। বুলগেরিয়া থেকে তাই যখন পাশের দেশ রোমানিয়াতে যাচ্ছিলাম থেকে তাই বিশেষ কিছু পেতে পারি সে প্রত্যাশা ছিলো না। সোফিয়ার এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হওয়ায় ভেবেই নিয়েছিলাম যে বুলগেরিয়ার ট্যুরকে আর দীর্ঘায়িত আর করবো না এবং রোমানিয়াতেও যাবো না। গোটা বুলগেরিয়া ট্যুরে কিছু না কিছু বাজে অভিজ্ঞতা লেগেই ছিলও প্রায় সময়ই। যে রকম আগ্রহ নিয়ে বুলগেরিয়া এসেছিলাম সোফিয়াতে প্রবেশের পর কেনও জানি সব কিছু পানসে হয়ে আসছিলও। তাই সরাসরি হাঙ্গেরিতে ফিরে যেতে চাইলাম কিন্তু সোফিয়া থেকে বুদাপেস্ট এর ফিরতি টিকেটের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার কারণে সেটা আর হয়ে উঠে নি। এ দিকে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া থেকে রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে এ যাওয়ার বাস টিকেটের দাম ছিলো মাত্র এক ইউরো. আমাদের দেশের টাকায় একশো টাকার কাছাকাছি। ঝুঁকি নিয়ে চলে গেলাম রোমানিয়াতে। আত্মীয়-স্বজনের অনেকে বলছিলো রোমানিয়াতে না যাওয়ার জন্য। গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইটালি, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন এ সকল দেশে যাঁরা থাকেন তাঁদের বেশীর ভাগ মানুষই রোমানিয়াকে আড় চোখে দেখে। রোমানিয়া এবং হাঙ্গেরি পাশাপাশি দুইটি রাষ্ট্রে হলেও হাঙ্গেরির সাথে রোমানিয়ার দ্বৈরথ দীর্ঘ দিনের। ট্রান্সসিল্ভানিয়া নামক একটা জায়গা আছে যেটা বর্তমানে রোমানিয়ার একটি অংশ। ট্রান্সসিল্ভানিয়ার মালিকানা নিয়ে এ দুই দেশের মধ্যাকার বৈরিতা সব সময় চরম । হাঙ্গেরির দাবি হচ্ছে ট্রান্সসিল্ভানিয়া আসলে তাঁদের অংশ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে যে “Treaty of Trianon” এর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলও তাঁর মাধ্যমে অন্যায়ভাবে ট্রান্সসিল্ভানিয়ার শাসনভার হাঙ্গেরির হাত থেকে নিয়ে রোমানিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিলও। হাঙ্গেরিয়ানদের জাতীয়তাবাদের সাথে এজন্য রোমানিয়ানদের জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা আর অভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরী করতে এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সৃষ্টি হয়েছে। হাঙ্গেরি এবং রোমানিয়া এ দুই দেশই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র।. তারপরেও এ বৈরিতার মাঝে কোনও ভাবে কোনও ভাটা পড়ে নি আর হাঙ্গেরি এবং রোমানিয়ার মধ্যাকার তিক্ততার ব্যাপারটি এতো গুরুতর হিসেবে দুই দেশের মানুষ দেখে থাকেন যে এখানে কোনও ধরণের ঠাট্টা করা চলে না। “Treaty of Trianon” এর চুক্তি হাঙ্গেরিয়ান আর রোমানিয়ান এ দুই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মাঝে এতো দূরত্ব সৃষ্টি করেছে যে এদের অনেকে মনে করে যে এরা একে অপরকে শেষ করে দিতে পারলে সব সমস্যার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। হাঙ্গেরিয়ানরা এক্ষেত্রে বেশী কর্কশ আর উগ্র। “ভ্লাদ দ্যা ইম্পলার” যিনি পাশ্চাত্য উপন্যাস কিংবা সিনেমাতে ড্রাকুলা নামে পরিচিত তাঁর জন্ম ট্রান্সসিল্ভানিয়ার অন্তর্গত সিগহিশোয়ারাতে এবং ভ্লাদ দ্যা ইম্পলার ছিলেন অর্থোডক্স খ্রিস্টানিটিতে বিশ্বাসী। ক্যাথলিক চার্চ কিংবা হাঙ্গেরিয়ান জাতীয়তাবাদ কোনোটির সাথে তাঁর সম্পর্ক নেই। তাই হাঙ্গেরিয়ানদের দাবি সত্যি এমনটি বলা যাবে না বরং হাঙ্গেরি যখন পূর্ব ইউরোপে একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় তখন অন্যায়ভাবে আশেপাশের কিছু জায়গাকে তাঁর দখলে নিয়েছিলও এবং ট্রান্সসিল্ভানিয়া হাঙ্গেরিয়ানদের দখল করা এমনই একটি বিতর্কিত অঞ্চল যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আবার রোমানিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ভারত এবং পাকিস্তান এ দুই দেশের মাঝে যে দ্বন্দ্ব তা কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবিদ্ধ। সামাজিক ক্ষেত্রে এ দুই দেশের মধ্যে কোনও বিভেদ নেই। ইউরোপে আসার পর অনেক জায়গায় আমি দেখেছি যে ভারত এবং পাকিস্তান এ দুই দেশের মানুষজনকে একে-অপরের সাথে নিবিড়ভাবে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে কিংবা এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে। হাঙ্গেরিয়ান আর রোমানিয়ানদের মাঝে সামাজিক বন্ধন খুব বেশী সুদৃঢ় হয়ও না সহজে। বুলগেরিয়াতে পা রাখার পর সেখানকার তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতা এবং একই সাথে যেহেতু আগেই অনেকের থেকে রোমানিয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক কথা শুনছিলাম এ জন্য রোমানিয়া সম্পর্কে আমার তেমন কোনও ইতিবাচক ধারণা ছিলো না সব কিছু মিলিয়ে এটা বলাবাহুল্য। চৌঠা এপ্রিল রাতে আমি রওয়ানা হই বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া থেকে রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টের উদ্দেশ্যে। বুলগেরিয়ার হাইওয়ে রাস্তাগুলো খুবই উন্নত এবং আধুনিক। দেখে মনে হয় যেনও নতুন করে রাস্তাগুলো ঢালাই করা। অন্ততঃ যে কয়েকটি রুটে আমি যাতায়াত করেছি সে কয়েকটি রুটের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। কিন্তু রোমানিয়াতে প্রবেশ করার পর দেখলাম হাইওয়ের রাস্তাগুলো কিছুটা অমসৃণ আর পুরোনো। মাঝে-মধ্যে বাংলাদেশের মতো ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়। সেখান থেকে ভয় লাগা শুরু; না জানি কোথায় এসে পৌঁছালাম। তবে বুলগেরিয়া আর রোমানিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকার চেক পোস্টে এর সময় একটা মজার কাহিনী ঘটেছিলো। একজন বর্ডার পুলিশ আমার কাছে আসলেন এবং আমাকে দেখার সাথে সাথে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন; অনেকক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো তিনি বোধ হয় কখনও কালো চামড়ার বাহিরের কোনও মানুষকে দেখেন নি। আমি তাঁকে আমার পাসপোর্ট আর স্লোভেনিয়ার রেসিডেন্ট পারমিট বের করে দিলাম কিন্তু তারপরেও আমার ওপর থেকে তাঁর দৃষ্টি বিন্দুমাত্রও সরলো না। কিছুক্ষণ পর তিনি চলে গেলেন। অতঃপর আরও কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর একজন পুলিশ অফিসার এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- “Do you speak English???” আমি বললাম “Of course, I can speak English.” তিনি আমাকে এরপর জিজ্ঞেস করলেন, “Where are you from?? And what do you do in Hungary?” আমি বললাম যে-“I am from Bangladesh and I study in Slovenia. I have come to Slovenia for completing my Bachelor of Science in Physics. And I am spending three months” তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-“What are you going to do in Romania ?” আমি উত্তর দিলাম যে “ I am travelling to Romania as a tourist. I am curious to learn about Romania and her culture, society and people”. এ কথা শুনে তিনি আমাকে বললেন-” I wish you a very pleasant time in Romania. Once you are here; you will never think to go back to any other country apart from Romania. Our society and culture will greatly make an impression on you and you will always think to come back to our country again and again. We may not be solvent economically like other European Nations but we have greater heart than most of the other nations. Welcome to Romania! And do not forget to finish your studies successfully. Study well and go back to your countries. For the prosperity and the development of your country, your country is looking for a youth like you.”পুলিশ অফিসারের সাথে কথোপকথনের অভিজ্ঞতা খানিক সময়ের জন্য আমার মনে আশার সঞ্চার করছিলো। বুখারেস্টের মিলিটারি অটোগারা স্টেশনে এসে আমাদের বাস থামে। বর্ডার থেকে বুখারেস্ট পৌঁছাতে তেমন একটা সময় লাগে নি বরং নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা আগে আমরা বুখারেস্টে পৌঁছে যাই। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর সাড়ে চারটা; এক বয়স্ক লোক এসে জিজ্ঞেস করে আমার ট্যাক্সি লাগবে কি না! আমি বললাম আমার ট্যাক্সির প্রয়োজন নেই; শুধুমাত্র বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটু জায়গা প্রয়োজন। তিনি আমাকে তখন ছোটো একটা জায়গা দেখিয়ে দিলেন বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। আমি একটু ভয়ের মধ্যে ছিলাম কারণ জায়গাটি ছিলো বুখারেস্ট শহরের সেন্ট্রাল বাস টার্মিনালের হাব। স্টেশনের ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখি মূল দরজা তালাবদ্ধ। বেলজিয়াম, জার্মানি, ডেনমার্ক কিংবা নরওয়ের কয়েকটি শহর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছিলাম এ সকল শহরে রাতে স্টেশনের ভেতরের রুম বন্ধ করার সময় একজন সিকিউরিটি গার্ড এসে যাত্রীদের বের করে দেন। যাত্রী ছাউনি ছাড়া অন্য কোথাও এ সময় কেউ অবস্থান করতে পারেন না। বুখারেস্টে তেমনটি হয় নি। রোমা নামক এক স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠীর অনেক মানুষ রয়েছে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে। এরা সাধারণভাবে জিপসি বা যাযাবর নামে পরিচিত; এরা দেখতে গতানুগতিক ইউরোপিয়ানদের মতো নয়। তাদের গায়ের চামড়া কিছুটা গাঢ় বর্ণের হয়ে থাকে। শারীরিক গড়নের দিক থেকে আমাদের এ উপমহাদেশের মানুষদের সাথে তাদের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। রোমা জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। এদের চালচলনের ভঙ্গিও ইউরোপিয়ানদের থেকে আলাদা। তুলনামূলকভাবে এরা অনেকটা অপরিষ্কার। অনেকে বলে রোমা জাতিগোষ্ঠীর এ সকল অধিবাসীদের পূর্ব পুরুষরা নাকি ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে কয়েক শতাব্দী পূর্বে ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন। পরে তারা ইউরোপ মহাদেশের বিভিন্ন দেশে স্থায়ী হয়ে যান। রোমা জাতিগোষ্ঠীর এ সকল মানুষেরা অনেক সময় বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হন। মূল যারা শ্বেতাঙ্গ রয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তারা এদের সাথে সহজে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এ কারণে রোমা জাতিগোষ্ঠীর এ সকল মানুষের আচরণে রুক্ষতা ফুঁটে উঠে, এরা অনেকটা কুঁড়ে স্বভাবের। ইউরোপের রাস্তাঘাঁটে আমরা ভিক্ষাবৃত্তির সাথে সংশ্লিষ্ট যাদেরকে খুঁজে পাই তাদের বেশিরভাগই এ রোমা সম্প্রদায়ের মানুষ। শিক্ষাক্ষেত্রেও তারা অনেক পশ্চাৎপদ। ইউরোপের সাধারণ মানুষদের অনেকে মনে করেন এরা ছোটোখাটো চুরি থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন অপরাধকর্মের সাথে জড়িত। বুখারেস্টের বাস স্টেশনে পা রাখার সাথে সাথে চারিদিকে শুধু তাদের অস্তিত্ব চোখে ধরা দিলো। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই দৌড়ায় পালায়। ইউরোপে আসার পর থেকে রোমা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক কথা শুনেছি। রোমানিয়া সম্পর্কেও অনেকে বাজে মন্তব্য করেছে। ভোরে মিলিটারি আটোগারার বাস স্টেশনে পা রাখার সাথে সাথে অনেকটা আঁতকে উঠলাম। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, ইতালি, সার্বিয়াসহ ইউরোপের অনেক জায়গায় বেশ কয়েকবার রোমা জাতিগোষ্ঠীর কিছু মানুষের সাথে আমার বাজে এক ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। বুলগেরিয়াতেও সেটার ব্যতিক্রম হয় নি। স্বভাবতঃ সে খারাপ অভিজ্ঞতার কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পর আচমকাই মিলিটারি অটোগারা থেকে সকলে যেনও হাওয়ায় মিশে গেলো, আমি একা বসে আছি তখন বলতে গেলে বাস স্টেশনে একা। আশেপাশে কেউ নেই, কোনও কিছু খোয়া যায় কি না এ ভয়ে চোখের পাতা এক করতে পারছি না। সকাল ছয়টার দিকে এক ভদ্র লোক এসে স্টেশনের ভেতরের ইনফরমেশন অফিস খুললেন; কিছুক্ষণ পর এক মাঝবয়সী মহিলা আসলেন আমার কাছে। আমাকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন ” Where are you from???” আমি বললাম যে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। তিনি বললেন যে ইংরেজিতে তাঁর দক্ষতা খুব একটা বেশী ভালো না। তারপরেও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তিনি বললেন যে তিনি ট্রান্সসিল্ভানিয়া থেকে এসেছেন এবং সেখানে ফিরে যাবেন। আমি তাকে বললাম যে দীর্ঘ দিন্ স্লোভেনিয়াতে থাকার সুবাদে সেখানে বসবাস করা অনেক হাঙ্গেরিয়ানের কাছে শুনেছি যে ট্রান্সসিলভানিয়া প্রকৃতপক্ষে হাঙ্গেরির অংশ কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ট্রান্সসিল্ভানিয়াকে হাঙ্গেরির থেকে নিয়ে রোমানিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়; তার কাছে আমি এ দাবির সত্যতা জানতে চাইলাম। তিনি আমার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর দিলেন যে এ কথাটি আসলে সত্য নয়। এরপর তিনি আমাকে তাঁর সাথে ট্রান্সসিলভানিয়াতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আমাকে তিনি বললেন যে যদি আমি ট্রান্সসিলভানিয়াতে যাই তিনি আমাকে সব ঘুরিয়ে দেখাবেন। সে মুহূর্তে আমার ট্রান্সসিলভানিয়া ঘুরার কোনো পরিকল্পনা ছিলো না তবে তাঁকে আমি বলি কোনো ট্রান্সসিলভানিয়াতে গেলে অবশ্যই দেখা করবো তাঁর সাথে। তিনি আমাকে তাঁর ফোন নাম্বার ও বাসার ঠিকানা দিয়ে বললেন “GOOD BYE!!! Have a nice trip to Bucharest and you are welcome in Transylvania too.” অতঃপর আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম; আমার মোবাইল ফোনে চার্জ ছিলো না। পাওয়ার ব্যাংকও কাজ করছিলো না। ইনফরমেশন ডেস্কে বসা সে ভদ্রলোককে বললাম আমার আমার মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়া যাবে কি না। তিনি আমার কাছ থেকে আমার ফোন আর চার্জার নিয়ে প্লাগ ইন করলেন কিন্তু দেখলেন যে আমার ফোনে চার্জ হচ্ছে না। আমাকে তিনি আমার মোবাইল ফোন ফেরত দিলেন, খানিক বাদে আবার গেলাম তাঁকে অনুরোধ করতে এবং তিনিও একইভাবে আমার কাছ থেকে আমার ফোন আর চার্জার নিয়ে প্লাগ ইন করলেন। এবার চার্জিং লেখা আসলো কিন্তু চার্জ আর হলো না। আমি আস্তে কেঁটে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর এসে তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোনটা নিলাম এবং দেখলাম আসলে তিনি ঠিক মতো প্লাগ ইন করতে পারেন নি; আমি তাঁকে দেখালাম। তিনি আমাকে ইশারা দিলেন যাতে আমি নিজ থেকে এবার চার্জারটাকে প্লাগ ইন করি। আমি ঠিকমতো ফোনটাকে চার্জে দিয়ে করে স্টেশনের ভেতরে এক কোণায় বেঞ্চের ওপরে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার পাশে আরও দুই জন ঘুমাচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আমার ঘুম ভাঙে। ইনফরমেশন ডেস্কে বসা সে ভদ্রলোকের কাছ থেকে আমার ফোনটা নিয়ে পাশে থাকা ওয়াশ রুমে যাই একটু ফ্রেশ হওয়ার জন্য। ওয়াশরুমের ভেতর প্রবেশ করতে এক এক রোমানিয়ান লিউ পে করতে হয় কিন্তু আমার কাছে কোনও রোমানিয়ান মুদ্রা ছিলো না। ফলে বেশ কিছুক্ষণের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম। তখন এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা আমাকে ইশারা দিয়ে বললেন ভেতরে যাওয়ার জন্য। আমি ওয়াশ রুমের ভেতরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। এরপর বের হওয়ার সময় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বলতে থাকলাম “ Thank you very much!” কোনও কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি হাসতে থাকলেন। পাশের বাস কাউন্টারের সামনে গিয়ে ডেস্কে থাকা এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করি “Do you speak English?” তাঁর পাশে বসা মেয়ে বলে উঠলো “How can I help you???” আমি বললাম যে আমি রোমানিয়াতে বেড়াতে এসেছি এবং আমার কাছে কোনও রোমানিয়ান মুদ্রা নেই; তবে কিছু ইউরো আছে। তাছাড়া তখন প্রায় সকাল সাড়ে সাতটার কাছাকাছি, সুতরাং আশেপাশের কোনও মানি একচেঞ্জও খোলার কথা না। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করি যদি তিনি আমাকে কিছু রোমানিয়ান লিউ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। তিনি আমাকে বললেন যে আমি কতো ইউরো একচেঞ্জ করতে চাই। আমি বললাম আমার আপাতত পাঁচ ইউরো একচেঞ্জ করতে পারলেই হবে। তিনি তাঁর পাশে থাকা মেয়েকে যাঁর সাথে আমি প্রথমে কথা বলেছিলাম তাঁকে এ পাঁচ ইউরো রেখে কিছু রোমানিয়ান লিউ দিতে বললেন। পাঁচ ইউরোর পরিবর্তে তিনি আমাকে ২১ রোমানিয়ান লিউ দিলেন। মার্কেট রেটও এরকম ছিলো। লিউ এর নোটগুলো দেখার সাথে সাথে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠলো; জীবনে এতো সুন্দর কাগজের নোট আমি আজ অবধি কখনও দেখি নি। রোমানিয়ার প্রত্যেকটি নোট পলিমারের তৈরি এবং একেকটি মুদ্রামানের নোট একেকটি শিল্পকর্মে আচ্ছাদিত। আমার ব্যবহার করা সবচেয়ে সুন্দর নোট এ রোমানিয়ান লিউ। তাঁদের দুই জনকে ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমি চলে যাই ওয়াশ রুমের দিকে সে ভদ্রমহিলাকে খুঁজে বের করার জন্য। তাঁর হাতে এক রোমানিয়ান লিউ এর নোট দিতে না দিতেই তিনি বলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ফরাসি ভাষায় বলে উঠলেন ” Merci beaucoup! Bonne journée.“ যার ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে “Thank you very much! Have a nice day.” এরপর বাস টার্মিনালের কাছে থাকা একটা দোকানে গেলাম এবং সেখান কিছু জিনিস কিনলাম। সোমালিয়ার কয়েকজন মেয়ের সাথে পরিচয় হলো, তাঁরা বুখারেস্টে বসবাস করেন এবং সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। তাঁদের সাথে কুশল বিনিময় করে আমি মিলিটারি অটোগারা থেকে বাহিরে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে ঠিক করলাম যে রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্ট দেখতে যাবো। রোমানিয়ানদের মাঝে একটি অদ্ভুত জিনিস আমি লক্ষ্য করলাম। তাঁরা পোশাকে-আশাকে একেবারে সাদামাটা, স্লোভেনিয়া কিংবা ইতালির স্থানীয় অধিবাসীরা পোশাকের ব্যাপারে অনেক শৌখিন। তবে রোমানিয়ানদের মাঝে সে বিষয়টা লক্ষ্য করা গেলো না। তবে রোমানিয়ান মেয়েরা মেক আপ আড় লিপস্টিকের প্রতি প্রচণ্ডমাত্রায় দুর্বল। রোমানিয়ায় মেয়েদের চুল দেখে বলে দেওয়া যায় তিনি বিবাহিত কী না। অবিবাহিত মেয়েরা চুল খোলা রাখতে পছন্দ করেন। তারা সাধারণত চুল বেণী করে থাকেন। বিবাহিত নারীরা মারামা নামক এক ধরণের কাপড় দিয়ে চুল ঢেকে রাখেন। মিলিটারি অটোগারা থেকে বের হতেই চোখে পড়লো দেশটির বৃহত্তম সামরিক যাদুঘর। বিভিন্ন ধরণের ট্যাংক, ফাইটার প্লেন, মিলিটারি যানবাহনসহ এককালে ব্যবহৃত বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্রে সুসজ্জিত এ মিউজিয়াম। পথিমধ্যে এক লোককে জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি ইংরেজি বোঝেনন কি না; তিনি বললেন যে তিনি ইংরেজি মোটামুটি বুঝেন। আমি তাঁকে বললাম যে আমি রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্ট পরিদর্শনে আগ্রহী। রাস্তার ঠিক উল্টো পাশে মিলিটারি মিউজিয়ামের সাথেই মেট্রো স্টেশন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে মেট্রোতে যাতায়াতে খরচ কেমন? তিনি উত্তর দিলেন মাত্র ২.৫ লিউতে ওয়ান ওয়েতে মেট্রো ভ্রমণের টিকেট পাওয়া যায়। মেট্রো স্টেশনে পৌঁছানোর পর ভেতরের কাউন্টার থেকে মেট্রোতে উঠার টিকিট কিনলাম এবং স্টেশনের ভেতরে ঢুকে আবারও এমন কাউকে খোঁজার চেষ্টা করলাম যিনি ইংরেজি বলতে পারেন। এক ভদ্র মহিলা আমাকে দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “How can I help you???” আমি বললাম যে “Could you please say to me how I can reach the parliament???” তিনি আমাকে বললেন, ” Are you new in Bucharest???” আমি উত্তর দিলাম, “Yes, I am here for the first time.” তিনি আমাকে বললেন, ” Come with me. I am taking you to the Parliament.” আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। রাস্তায় আমার সাথে তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো। আমি ধীরে ধীরে অনুধাবন করতে লাগলাম যে রোমানিয়ানদের সম্পর্কে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মানুষ যে ধরণের ধারণা পোষণ করেন বাস্তবে রোমানিয়ানরা তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি বলবো, পৃথিবীর কোনও জাতির মানুষের যদি সত্যিকারের হৃদয় বলে কিছু থাকে সেটা কেবলমাত্র রোমানিয়ানদের মধ্যেই আছে। ভদ্র মহিলা আমাকে রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্টে পৌঁছে দিলেন। বুখারেস্টের মেট্রো সার্ভিস ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে অন্যতম সেরা মেট্রো সার্ভিসের একটি হিসেবে হিসেবে দাবি করার যোগ্যতা রাখে। গোটা ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে সস্তায় মেট্রোতে ঘুরা যায় রোমানিয়াতে। মেট্রোর গতি, টিকেট কাউন্টারের পরিসেবা থেকে আরম্ভ করে সঠিক গন্তব্য নিরূপণে সরলতা এবং প্রত্যেকটি স্টপেজে সেবার মান প্রায় একই ধরণের। রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্টের কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে আমার চোখ কপালে উঠার মতো অবস্থা সে এক বিশাল অট্টালিকা। এতো বিশাল যে পুরো পার্লামেন্টের চারদিকে একবার চক্কর দিলে দুই দেড় থেকে দুই কিলোমিটার (বা এর বেশীও হতে পারে) হাঁটা হয়ে যাবে। আশেপাশের পথচারী যাদেরকে দেখলাম সকলকে অনুরোধ করলাম আমার ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। তাঁরা আমার ছবি তুলে দিলো অত্যন্ত যত্ন সহকারে এবং সবারই একই প্রশ্ন “Where are you from??? Why have you you come to Romania?” আমি উত্তর দিই যে “I am from Bangladesh. I have come to Romania as a tourist.” সবারই এক উত্তর, ” You are welcome in Romania. Since you have come to Romania; you must have some good pictures.” ছবি তোলার পর অনেকে আবার তাদের সাথে এক কাপ কফি পান করার জন্যও আহবান জানিয়েছে। যাঁদের কাছে অনুরোধ করেছি ছবি তোলার জন্য প্রায় সকলে আগ্রহ ও যত্ন সহকারে ছবি তুলে দিয়েছে এবং ছবি তোলা শেষে জিজ্ঞেস করেছে “Is it okay??? If you are not satisfied with it; I may try more for you.” পার্লামেন্টের প্রবেশ দরজায় দেখলাম এক সিকিউরিটি গার্ড। তিনিও ইংরেজি বলতে পারেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে পার্লামেন্টের ভেতরে প্রবেশের জন্য টিকেট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ইউরোতে পেমেন্ট করা যায় কি না। তিনি আমাকে ভেতরে যেতে বললেন এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট কারও সাথে কথা বলার পরামর্শ দিলেন। কোনও রকম চেক ছাড়াই তিনি আমাকে সাদরে ভেতরে প্রবেশ করতে দিলেন; সামনের দিক থেকে পার্লামেন্ট দেখতে অসাধারণ। কিছুটা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মূল অফিস ভবনটির সাথে রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্টের স্থাপত্য নকশায় মিল পাওয়া যায়। পার্লামেন্টের মেইন গেইটের সামনে অনেকগুলো গাড়ি পার্ক করা ছিলো। কার পার্কিং এর সামনে দেখলাম এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। মাঝ-বয়সী এক লোক এবং তাঁর পোশাকের ধরণ দেখে মনে হলো যে তিনি পার্লামেন্টের অভ্যন্তরে কোনও একটি পদে চাকুরী করেন। আমি তাঁকেও অনুরোধ করলাম পার্লামেন্টের এন্ট্রান্স থেকে আমার কয়েকটি ছবি তুলে দিতে; তিনিও অত্যন্ত যত্ন সহকারে আমার কয়েকটি ছবি তুলে দিলেন এবং আমাকে বললেন সম্পূর্ণ পার্লামেন্টকে উপজীব্য করে তিনি একটি ছবি তুলতে চান যদিও সেটা খুবই দুরূহ বিষয় ছিলো। সত্যিকার অর্থে পার্লামেন্টটি অত্যন্ত বিশাল আকৃতির। ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকেই তিনি আমাকে এ পার্লামেন্ট সম্পর্কে কিছু ইনফরমেশন দিলেন। রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্টকে স্থানীয় ভাষায় “Parlamentul României” (পারলামেন্তুল রোমানেই) নামে ডাকা হয়। ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত পেন্টাগনের রোমানিয়ার পার্লামেন্ট ভবনটি সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম নির্মাণ। রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্টকে এ যাবৎ কাল পর্যন্ত এ পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী নির্মাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এ পার্লামেন্ট নির্মাণ করতে গিয়ে দেশটির এক সময়ের রাষ্ট্রনায়ক নিকোলেই চশেস্কু অন্যায়ভাবে আশেপাশের অনেক স্থান থেকে জোরপূর্বক জমি দখল করেন এবং সেখান থেকে অনেক মানুষকে উচ্ছেদ করেন। রোমানিয়ার পার্লামেন্ট দুই কক্ষ বিশিষ্ট। রোমানিয়ার স্থানীয় ভাষায় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষটি “সিনাত” এবং নিম্ন কক্ষটি “কামেরা দেপুতাতিলোর” নামে পরিচিত। পার্লামেন্টের ভেতর তিনটি ভিন্ন ধরণের মিউজিয়াম, একটি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টার, দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্থপতি আলেকজান্দ্রু আইওয়ান কুজার স্মরণে একটি গ্যালারি এবং আন্ডারগ্রাউন্ডে একটি বাঙ্কার রয়েছে যেটি সকল ধরণের পারমাণবিক হামলা প্রতিরোধে সক্ষম। ১৯৮৪ সালে এ ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং এ ভবনটির মূল নকশা প্রণয়ন করেছিলেন রোমানিয়ার বিখ্যাত মহিলা স্থপতি আনকা পেট্রেস্কু। পুরো ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হতে তেরো বছর সময় লেগেছিলো।
বুখারেস্টের অন্যতম মেট্রো স্টেশন
সম্পূর্ণ পার্লামেন্ট ভালোভাবে দেখতে হলে সর্বনিম্নে দুই দিন্ দরকার, আমি কথার ফাঁকে লোকটিকে প্রশ্ন করেই বসলাম ট্রান্সসিলভানিয়া সম্পর্কে। আমি তাঁকে বললাম যে আমি অনেক হাঙ্গেরিয়ানকে বলতে শুনেছি যে ট্রান্সসিলভানিয়া না কি প্রকৃতপক্ষে হাঙ্গেরির অংশ কিন্তু রোমানিয়া না কি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যস্থতায় এ জায়গাটির মালিকানা লাভ করে। এ দাবিটির সত্যতা সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করলাম। তাঁর উত্তর ছিলো যে ভ্লাদ দ্যা ইম্প্যালার যিনি ড্রাকুলা নামেই বেশি পরিচিত সবার কাছে, তাঁর জন্ম হয়েছিলো সিঘিশোয়ারাতে। সিঘিশোয়ারা বর্তমানে যেটা ট্রান্সসিলভানিয়া অন্তর্গত। ভ্লাদ দ্যা ইম্প্যালার রোমানিয়ানদের রাজা ছিলেন; হাঙ্গেরিয়ানদের সাথে তাঁর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিলো না বলে তিনি উল্লেখ করেন। এজন্য তাঁর এ বক্তব্য অনুযায়ী ট্রান্সসিলভানিয়া নিয়ে হাঙ্গেরিয়ানদের এ দাবি যুক্তিযুক্ত নয়। বরং ট্রান্সসিলভানিয়াকে হাঙ্গেরি রোমানিয়ার কাছ থেকে নিজেদের দখলে নেয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে ট্রান্সসিলভানিয়ার অধিকার রোমানিয়ার হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম পার্লামেন্টের ভেতরে প্রবেশের টিকেট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ইউরো গ্রহণ করা হয় কি না। আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন যে আমাকে ইউরো একচেঞ্জ করতে হবে। পার্লামেন্ট থেকে বের হয়ে একটু হাঁটলে সিটি সেন্টার। সিটি সেন্টার থেকে তিনি আমাকে সেখান থেকে ইউরো একচেঞ্জ করে আনতে বললেন। আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিটি সেন্টারের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
রাকিব হাসান রাফি
