ইতিহাস, শিল্প আর সৌন্দর্যের অনন্য নগরী
প্রাগ—যে শহরকে বিশ্ববাসী চেনে “Prague” নামে। এটি বর্তমান Prague এবং সাবেক Czechoslovakia-এর রাজধানী। অনিন্দ্যসুন্দর এই শহর যুগে যুগে মুগ্ধ করেছে বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সবাইকে। প্রাগের সরু অলিগলি, চারকোনা পাথরে বাঁধানো রাস্তা, লাল টালির ছাদের বাড়িঘর, প্রতিটি স্থাপনার গায়ে শিল্পীর তুলির স্পর্শ, মনোমুগ্ধকর Vltava River এবং পুরোনো দিনের লাল রঙের ট্রাম—সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। শহরটির বাহ্যিক সৌন্দর্য যেমন মন কেড়ে নেয়, তেমনি এর অন্তরের সৌন্দর্য মানুষকে আরও গভীরভাবে মুগ্ধ করে।
প্রাগের রাস্তায় হাঁটলেই ভেসে আসে বেহালার সুর। রাস্তার ধারে ছোট-বড় অসংখ্য আর্ট গ্যালারি, ক্যাফে আর কফিশপে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা যেন শহরের নিত্যদিনের দৃশ্য। দিন হোক বা রাত—প্রাগ সর্বদাই জীবন্ত, সৃজনশীল এবং প্রাণবন্ত।
এমন একটি শহরের সামান্য ক্ষতিও করতে নিষ্ঠুরতম মানুষের মনেও দ্বিধা জাগে। ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত স্বৈরশাসক Adolf Hitler-এর কাছেও প্রাগ ছিল বিশেষ প্রিয়। কথিত আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে চেকোস্লোভাকিয়া দখলের পরিকল্পনা করার সময় তিনি তাঁর সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন প্রাগের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের কোনো ক্ষতি না হয়।
হিটলারের বাহিনী সেই নির্দেশ অনেকটাই মেনে চলেছিল। তবে যুদ্ধের ক্ষত থেকে পুরোপুরি রক্ষা পায়নি শহরটি। মিত্রবাহিনীর তিন দফা বিমান হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তবুও সৌভাগ্যবশত প্রাগের অধিকাংশ ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। সেই কারণেই আজও মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শনগুলো প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে।
বিশ্বকবি Rabindranath Tagore-এর পদধূলিতেও ধন্য হয়েছে প্রাগ। ১৯২১ সালের ২১ জুন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নবগঠিত চেকোস্লোভাকিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি Tomáš Garrigue Masaryk-এর আমন্ত্রণে তিনি প্রাগে আসেন। পরে ১৯৩৫ সালেও আবার এই শহর সফর করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকায় বিধ্বস্ত চেকোস্লোভাকিয়ার মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে লিখেছিলেন—
“Friends in Czechoslovakia, in the terrible storm of hated violence raging over humanity, accept the goodwill of an old idealist who clings to his faith in the common destiny of the East and West and all people on the Earth.”
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রাগের কথা খুব বেশি উল্লেখ না করলেও শহরটি তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। প্রাগে তাঁর নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে—Thákurova Ulice। সেখানে তাঁর একটি আবক্ষ ভাস্কর্যও স্থাপন করা হয়েছে। ভাস্কর্যের বেদিতে লেখা রয়েছে—
“Tagore was not only a poet and a writer. He was a Renaissance personality…”
রবীন্দ্রনাথের সফরসঙ্গী ছিলেন চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক Vincenc Lesný। পরবর্তীকালে তিনি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন এবং ভারত-চেক সাংস্কৃতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনে পরিণত হন।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণলেখক Syed Mujtaba Ali-ও প্রাগের প্রেমে পড়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণরচনা ‘বিশ্বভারতীর প্রাগ’-এ তিনি লিখেছেন—
“প্রাগ শহর বড় বিচিত্র শহর… শহরটি বাস্তবিকই বড় সুন্দর।”
তিনি আরও লিখেছেন, প্রাগের মানুষের আন্তরিকতা তাঁকে বিস্মিত করেছিল। একদিন পথ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় এক অচেনা তরুণী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনার কি কোনো সাহায্যের প্রয়োজন?” মুজতবা আলীর ভাষায়—“এ শুধু প্রাগেই সম্ভব!”
মুজতবা আলীর লেখায় যে ‘মলডা’ নদীর কথা এসেছে, সেটিই আজকের ভালতাভা নদী। জার্মান ভাষায় এর নাম Moldau, আর চেক ভাষায় Vltava। ‘Vltava’ শব্দটির উৎস প্রাচীন জার্মানিক শব্দ Wilt Ahwa, যার অর্থ ‘Wild Water’ বা ‘উচ্ছল নদী’।
প্রাগের মানুষের শিল্পবোধ, নান্দনিকতা, সাহিত্যচর্চা, স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং মুক্ত সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসাই শহরটিকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় নগরীতে পরিণত করেছে। প্রতিবছর চেক প্রজাতন্ত্রে প্রায় ২০ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করেন, যার মধ্যে প্রায় ৮ মিলিয়ন মানুষ শুধু প্রাগেই আসেন।
এই বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাচীন দুর্গ কমপ্লেক্স—Prague Castle। এরপর রয়েছে Charles Bridge, Old Town Square, Astronomical Clock, St. Vitus Cathedral-সহ অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেগুলো প্রাগকে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী নগরীতে পরিণত করেছে।
লেখক: মোহাম্মদ আবুল বাশার
